বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

আফ্রিকা যাওয়ার প্রলোভনে পড়ে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের তরুণ রায়হানের মৃত্যু  

নুরুল আলম, মিরসরাই :

আফ্রিকায় চাকরি/ব্যবসার সুযোগ দেখিয়ে দালাল চক্রের জালিয়াতিতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের তরুণ সাইফুদ্দিন মাহমুদ রায়হান (২১) নিহত হয়েছেন। পরিবার বলছে— ছেলের লাশ পাওয়া যাচ্ছে না এবং দালালরা তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ৫ লাখ টাকা।

নিহতের পরিবার ও সফরসঙ্গীরা অভিযোগ করছেন, রায়হানকে প্রলোভনে নিয়ে গিয়ে ভুয়া রুটে পাঠানো হয়; কষ্টকর পদচারীর পর এক দুর্যোগপূর্ণ পাহাড়ি অংশে তার মৃত্যু হয় এবং পরে লাশ জাম্বিয়ার কোনো পাহাড়ে পুঁতে ফেলার কথাও শোনা যাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের বর্ণনায়, মৃত রায়হান কাটাছড়া ইউনিয়নের পশ্চিম দূর্গাপুর গ্রামের দরবেশ আলী সারেং বাড়ির বাসিন্দা ও আফ্রিকা প্রবাসী ছালাহ উদ্দিনের বড় ছেলে। ছেলেকে আফ্রিকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করার নাম করে নোয়াখালীর এক দালাল জয়নাল আবেদীন ফারুককে পরিবার ৫ লাখ টাকা প্রদান করেন। গত মাসের ২৭ সেপ্টেম্বর রায়হানসহ ছয় তরুণ ঢাকার চাংখারপুর অঞ্চলের মুনিম শাহরিয়ার থেকে পাসপোর্ট ও এয়ারটিকেট পেয়ে আফ্রিকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়—কথা ছিল দুবাই বা কাতার ট্রানজিট হয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো হবে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, দালালচক্র তাদের ইথিওপিয়ায় নিয়ে যায়। এরপর তারা সড়ক ও সীমান্তরাস্তায় পায়ে হেঁটেই মালাবো, কঙ্গো হয়ে জাম্বিয়ার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছাতে চেষ্টা করে।

সফরসঙ্গীদের বর্ণনায়, যে সময়ে রায়হান ক্লান্ত হয়ে পড়ে, স্থানীয় কিছু মানুষ তার পথ দেখানোর (‘পথপ্রদর্শক’) দায়িত্বে ছিল—তারা তাকে কাঁধে তুলে নেয়ার চেষ্টা করলে রায়হানের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে; কাঁধ থেকে জোরে নীচে ফেলে দেওয়া হলে সে ধীরে ধীরে জ্ঞান হারাতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত মারা যায়। মৃত্যুর আগে রায়হান বলে বলে উঠেছিলেন, “আমার পাসপোর্ট আর জুতার জোড়া আব্বার কাছে পৌঁছে দিয়েন।” তার সফরসঙ্গীরা জানান, ঘটনাস্থলে তার মৃত্যুর পর লাশ কোথায় আছে— তা কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না; কেউ কেউ বলছে—তাকে মেরে জাম্বিয়ার কোনো পাহাড়ে পুঁতে ফেলেছে।

নিহত রায়হান স্থানীয় ওয়াহিদুন্নেসা উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি-২৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি দুই ছোট ভাই সিয়াম উদ্দিন রিহান ও আল আমিন আবির রেখে গেছেন। মৃত্যুর খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যদের মাঝে শোক ও অসহায়তার জোরালো প্রকাশ—মায়ের বারবার মূর্ছা যাওয়া, দাদীর কষ্টে আকুল কণ্ঠরোধ।

নিহত রায়হানের মামাতো ভাই নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আইনুল হাসনাত রাজু বলেন, “রায়হানের মৃত্যুর খবর আমি প্রথম পেয়েছি গতরাত (দিবাগত রাত ১টা)। পরে সফরসঙ্গীদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা মৃত্যুর বর্ণনা দিয়েছে। তবে দালালরা ফোন ধরছে না, আর কেউ নির্দিষ্টভাবে লাশ কোথায়— তা বলছে না। আমরা সরকারের কাছে দালালদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানাই।”

পরিবার সদস্যরা জানান, তারা যেকোনো মূল্যে ছেলে রায়হানের মরদেহ চাইছেন এবং দালালচক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছেন। জেঠা কামাল উদ্দিন বলেন, “আমাদের ছেলে ফিরিয়ে দিন—আমরা তার লাশ চাই। আমার ভাইয়ের বউ এত দুখে এক ফোঁটা পানি পর্যন্ত খাচ্ছে না।”

মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার সোমাইয়া আক্তার এ ব্যাপারে বলেন, “আমার কাছে এ বিষয়ে পূর্বে কোন তথ্য ছিল না; এখন আপনার মাধ্যমে জেনেছি। আমি বিষয়টি খুঁজে দেখব। ভুক্তভোগী পরিবার যদি আইনি সহায়তা চান, আমি আমার এখতিয়ারে থাকা যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করবো।” তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত খোঁজ-খবর ও প্রয়োজনীয় তদবির চালাতে নির্দেশ দিতে পারেন বলে পরিবারকে আশ্বস্ত করেছেন।

স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোকে ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে বলে পরিবারি সূত্রে জানা গেছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে—দালালদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে নেয়া অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া এবং অনতিবিলম্বে রায়হানের মৃতদেহ উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হোক। পরিবার ও গ্রামবাসীরা স্থানীয় প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন—যত দ্রুত সম্ভব সঠিক তদন্ত ও প্রতিকার চান তারা।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত