চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী শফিকুল বারী। ভর্তি হয়েছিলেন ১৯৯৯-২০০০ শিক্ষাবর্ষে। সময়ের হিসেবে কেটে গেছে এক চতুর্থাংশ শতাব্দী, তবু এখনো তাঁর ছাত্রজীবনের ইতি টানেননি তিনি। বয়স এখন চল্লিশ পেরিয়ে গেছে, চুলে পড়েছে পাক, তবু হাতে বই, চোখে স্বপ্ন, মনে সেই আগের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ভালোবাসা।
২৫ বছর ধরে এই মানুষটি এখনো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চেনা মুখ। অনেকেই তাঁকে মজা করে বলেন, “বারী ভাই, আপনি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী বাসিন্দা!”—কিন্তু তিনি হাসিমুখে জবাব দেন, “আমি এখনো ছাত্র, কারণ শেখার তো শেষ নেই।”
প্রথম দিকে অর্থনীতি বিভাগে পড়াশোনা করলেও পরে তিনি একে একে এমবিএ, ইংরেজি সাহিত্য, ইসলামী ইতিহাসসহ নানা বিষয়ে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাটহাজারী মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদিস শেষ করেন। তাঁর ভাষায়, “জ্ঞানার্জনের কোনো শেষ নেই। আমি যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন ছাত্র হিসেবেই থাকতে চাই।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ছাত্রছাত্রীদের কাছে বারী ভাই এখন এক কিংবদন্তি নাম। প্রজন্ম বদলে গেছে অনেকবার, কিন্তু তিনি রয়ে গেছেন একইভাবে—বই হাতে, লাইব্রেরির সামনে, কিংবা কলার ঝুপড়িতে এক কাপ চা নিয়ে বসে থাকা মানুষটি। নতুন শিক্ষার্থীরা প্রথমে তাঁকে শিক্ষক ভাবলেও পরে অবাক হয়—জানতে পারে, তিনি আসলে এখনো ‘ছাত্র’।
বন্ধুরা বলেন, এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তাঁর জীবনে এসেছিল এক ভালোবাসার গল্প। সাংবাদিকতা বিভাগের এক সহপাঠিনীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠলেও, প্রকাশের আগেই মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়। এরপর থেকেই বারী ভাই নিজের জীবনকে জ্ঞানের পথে উৎসর্গ করেন।
এক বন্ধুর ভাষায়, “তিনি প্রেমে হেরেছিলেন, কিন্তু জীবনে জিতেছেন। কারণ তিনি এখনো পড়ছেন, এখনো নিজেকে গড়ে চলেছেন।”
বছরের পর বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব শিক্ষক-শিক্ষার্থী তাঁকে চেনেন। কেউ বলেন, তিনি ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস’, কেউ বলেন ‘অমর ছাত্র’। অনেকেই মজা করে বলেন, “যতদিন বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, ততদিন বারী ভাইও থাকবেন।”
নিজের জীবনের বিষয়ে শফিকুল বারী বলেন, “আমার কাছে বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু শিক্ষা নয়, এটা একটা অনুভব, একটা ভালোবাসা। আমি এখানেই বড় হয়েছি, এখানেই নিজেকে চিনেছি। তাই মনে হয়, এখানেই আমার জীবনের শেষটাও হবে।”
একই বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই যুগ ধরে ছাত্রজীবন টিকিয়ে রাখা এই মানুষটি যেন এক অনন্য প্রতীক—ভালোবাসার, অধ্যবসায়ের, আর অদম্য শেখার আকাঙ্ক্ষার। তাঁর মুখের শান্ত হাসি যেন বলে দেয়, “ছাত্রজীবনের কোনো শেষ নেই, যদি শেখার ইচ্ছে জীবিত থাকে।”


