মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
Single Top Banner

১৩ বছরেও নেই খোঁজ: মায়ের প্রশ্ন তোহেল কি ফিরবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ব্রামোত্তর গ্রামের প্রবাসী কোব্বাত আহমেদের ছেলে তোহেল আহমেদ নিখোঁজ হওয়ার পর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৩ বছর। সময়ের কাঁটা ঘুরে ঘুরে দিন, মাস, বছর বদলেছে; কিন্তু তোহেলের কোনো সংবাদ নিয়ে কেউ আর দরজায় কড়া নাড়েনি। ছেলে বেঁচে আছে নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর আজো জানে না পরিবার। অনিশ্চয়তার এই দীর্ঘ পথযাত্রায় মায়ের বুক আজও উত্তপ্ত শূন্যতায় ভরা, তবুও একটুকরো আশার আলো সে নিভতে দেয়নি—একদিন ছেলে ফিরে আসবে, ‘মা’ বলে ডাকবে।

২০১২ সালের ২০ অক্টোবর। সেদিন সকাল সাড়ে ৮টা। চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানার বহদ্দারহাট আবাসিক এলাকার ভাড়া বাসা থেকে সানোয়ারা ইসলাম বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী তোহেল প্রতিদিনের মতো স্কুলে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিল। বি-ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের ৬৫ নম্বর বাসায় চাচার সঙ্গে থাকত সে। কিন্তু সেদিনই শেষ দেখেছিল পরিবার। সেই বের হওয়াই যেন তার অজানা গন্তব্যে যাত্রা। আর কোনোদিন সে বাড়ি ফেরেনি।

তোহেলের মা বেবী আকতার আজও সেই দিনের কথা মনে করে বুক চাপড়ান। তিনি বলেন, “ভেবেছিলাম দুপুরে ফিরবে। সময় পার হতে লাগল, আর আমার হৃদয়ে ভয় ভর করতে লাগল। রাত পেরুল, অপেক্ষা থামল না। কোথায় খুঁজিনি! আত্মীয়, বন্ধুরা, পাড়া-প্রতিবেশী—সবাইকে নিয়ে খুঁজেছি। তবুও ছেলেটাকে পাইনি। ছেলের কোনো শত্রু ছিল না। আমাদের কারও সঙ্গেও শত্রুতা নেই। কেন ওকে এমন করে নিখোঁজ হতে হবে?” দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর কোনও সন্ধান না পেয়ে ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি চান্দগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি। জিডি নম্বর ১৬৩৪। তারপর কেটে গেছে এক যুগেরও বেশি সময়, কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো সুরাহা নেই।

মা বলেন, “বিশ্বাস করতে পারি না ছেলে মারা গেছে। আমার মন বলে ও বেঁচে আছে। একদিন ফিরে আসবে। আমি শুধু সেই দিনের আশায় বেঁচে আছি।” তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় যন্ত্রণা, অপেক্ষা আর না-বলা আকুতির শব্দ।

ঘটনার সময় দুবাইয়ে ছিলেন তোহেলের বাবা কোব্বাত আহমেদ। আজও প্রবাসে থেকেও ছেলের স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফেরে। তিনি বলেন, “আমার একটাই ছেলে। তাকে হারিয়ে সবকিছু যেন ভেঙে পড়েছে। মনে হয় হয়তো অপহরণ করেছে কেউ। কিন্তু কেন? কোনো কারণ খুঁজে পাই না। পুলিশের উদাসীনতা না থাকলে হয়তো আজ সত্যটা জানতে পারতাম।” তিনি নতুন করে তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, “আমি শুধু ছেলের খোঁজ চাই।”

পুলিশ জানায়, ২০১৩ সালে নিখোঁজের জিডির পর তদন্ত হয়েছিল। তবে তেমন কোনো তথ্য মেলেনি। বর্তমানে তদন্ত চলমান কিনা—এ বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন। পরিবার চাইলে মামলা বা আইনি সহায়তা নিতে পারে।

কিন্তু পুলিশি তদন্তের আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে যে বড় সত্যটি চাপা পড়ে আছে, তা হলো—এক মায়ের প্রতিদিনের অপেক্ষা, এক বাবার গভীর বেদনা, আর এক পরিবারের নিদারুণ অনিশ্চয়তা। তোহেলের ঘরের বিছানাটি আজও তেমনই পড়ে আছে। আলমারির ভাঁজে রাখা তার পুরোনো পোশাক, স্কুল ব্যাগ—সব কিছুই যেন অপেক্ষা করছে সেই ফিরে আসার দিনের জন্য। সন্ধ্যা নামলে বেবী আকতার দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন—হয়তো কোনো শব্দ হবে, হয়তো….

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত