বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

চবিতে হিজাব পরে আত্মগোপনে ছাত্রলীগকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ কর্মী দিদারুল ইসলাম শুভকে আটক করার পর একে একে বেরিয়ে আসছে ভয়াবহ সব তথ্য। ছদ্মবেশে হিজাব পরে ঘোরাফেরা করতেন তিনি। আর সেই ছদ্মবেশের আড়ালেই গড়ে তুলেছিলেন অশ্লীল ভিডিও তৈরির একটি গোপন কারখানা ও ষড়যন্ত্রের নেটওয়ার্ক।

সোমবার (২৮ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ২৪ হলের সামনে থেকে তাকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ ছিল, একজন শিক্ষার্থীকে জোর করে হল থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে শুভর মোবাইল ফোন ঘেঁটে পাওয়া তথ্য পাল্টে দেয় চিত্র।

আটকের পর তার মোবাইল থেকে উদ্ধার হয় প্রায় এক হাজার অশ্লীল ভিডিও ও ছবি, যার অধিকাংশই গোপনে ধারণ করা—ভুক্তভোগীরা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তদন্তে জানা গেছে, পরিকল্পিতভাবে সম্পর্ক গড়ে তুলে পরে গোপনে ভিডিও ধারণ করতেন তিনি। এসব ভিডিও পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইলিংয়ে ব্যবহার করা হতো। ক্যাম্পাসে পরিচিত অনেক মুখই এসব ভিডিওতে শনাক্ত হয়েছেন বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

শুধু নারী কেলেঙ্কারিই নয়, শুভর বিরুদ্ধে রয়েছে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকারও অভিযোগ। ‘হৃদয়ে ৭১’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপসহ কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত সরকারবিরোধী উসকানিমূলক বার্তা ছড়াতেন তিনি। একটি বার্তায় লেখা ছিল, “আগামী মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার অনুরোধ রইলো… ইউনুস সরকার এই বিষয়ে প্রশাসনকে হুশিয়ারি দিয়েছে।” প্রশাসনের ধারণা, এটি কোনো বড় ধরনের গোপন পরিকল্পনার অংশ হতে পারে।

তদন্তে আরও বেরিয়ে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক তথ্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গতিবিধি নিয়মিত পাঠানো হতো ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রেজাউল ইসলাম রুবেলের কাছে। মেসেঞ্জারে পাঠানো এমন একাধিক বার্তার স্ক্রিনশট উদ্ধার করেছে তদন্তকারীরা। এতে প্রশ্ন উঠেছে—বহিষ্কৃত এক কর্মী কীভাবে সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন?

শুভ নিজেকে আড়াল করতে জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধনে জালিয়াতির আশ্রয় নেন। ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে অবস্থান করেছেন তিনি। প্রশাসন মনে করছে, এসব অপরাধ তিনি একা করেননি—তার পেছনে কাজ করেছে একটি সুসংগঠিত চক্র।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর নুরুল হামিদ কানন বলেন, “প্রাথমিকভাবে অপহরণের অভিযোগে তাকে আটক করি। পরে মোবাইল ঘেঁটে দেখি, সে একাধিক ছাত্রীকে গোপনে ভিডিও করেছে, রাষ্ট্রবিরোধী বার্তা ছড়িয়েছে এবং জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে ক্যাম্পাসে ছিল। তাৎক্ষণিকভাবে আমরা তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করি।”

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, শুভকে যারা আশ্রয় দিয়েছে, কিংবা এ চক্রে যারা জড়িত—তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। যথাযথ প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শুভ বিবাহিত এবং ২০২১ সালে তার বিরুদ্ধে করা একটি যৌতুক মামলাও রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্কিত ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নতুন নয়, তবে এত ভয়াবহ ও সুপরিকল্পিত অপরাধের নজির সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি। একজন বহিষ্কৃত ছাত্ররাজনীতিক কীভাবে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ছদ্মবেশে থেকে নারীদের ফাঁদে ফেলেছে, ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করেছে, এমনকি সরকারের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে—এ প্রশ্ন এখন পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত