বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

দুই দশক ধরে হচ্ছে না চুয়েট ছাত্র সংসদ নির্বাচন

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চুয়েটেকসু) দুই দশক ধরে অচল হয়ে আছে। সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০০২ সালে। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ ও ২০০৫ সালে ভোট ছাড়াই ছাত্রদল–সমর্থিত প্রার্থীদের কমিটি গঠন করা হলেও এরপর থেকে আর কোনো কমিটি হয়নি। সেই থেকে ছাত্র সংসদের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ সেপ্টেম্বর এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ অক্টোবর ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চুয়েটের শিক্ষার্থীরাও সংসদ চালু হবে কি না—এই প্রশ্নে সরব হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে নির্বাচন আয়োজনের দাবি তুলেছেন।

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০২ সালের ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ছাত্রদল–সমর্থিত শফিউল আজম সহসভাপতি ও নুরুল আজম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তী দুই দফায় ভোট ছাড়াই কমিটি ঘোষণা করা হয়। ২০০৩ সালের কমিটিতে ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন মনসুর আহমেদ। তিনি বলেন, বিএনপি–জামায়াত জোট সরকারের সময় ছাত্রদল–ছাত্রশিবির সমঝোতার ভিত্তিতেই কমিটি গঠন হয়েছিল। ২০০৫ সালের কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাহাত হায়দার জানান, প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় তখন নির্বাচন হয়নি, সমঝোতার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সংসদের একটি পদ ছাত্রশিবিরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

চুয়েটেকসুর যাত্রা শুরু হয় ১৯৭০ সালে। প্রথম ভিপি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী মোসাদেকুজ্জামান। তবে ২০০৫ সালের পর থেকে কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা ২০১১ সালে আন্দোলন করে নির্বাচন দাবিতে সরব হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩তম সিন্ডিকেট সভায় ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে ভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত হলেও প্রশাসন ছয় দিন যেতে না যেতেই নির্বাচন স্থগিত করে দেয়। নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও সময় সাপেক্ষ প্রস্তুতির অজুহাত দেখিয়ে নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর আর কোনো উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন।

অচল সংসদের মাঝেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিবছর ১০০ টাকা করে সংসদ ফি আদায় করা হচ্ছে। চার বছরের কোর্সে একজন শিক্ষার্থীকে গুনতে হচ্ছে ৪০০ টাকা। বর্তমানে ৪ হাজার ৬২৫ শিক্ষার্থী থেকে বছরে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা সংসদ তহবিলে জমা হচ্ছে। এই অর্থ কোথায় যাচ্ছে তা শিক্ষার্থীরা জানেন না। পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, “২০ বছর ধরে সংসদ নেই, অথচ আমরা প্রতিবছর ফি দিচ্ছি। সংসদ গঠন না হলে ফি নেওয়া বন্ধ করতে হবে। আর এত দিনে যা জমেছে, তারও হিসাব চাই।” ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক মাহবুবুল আলম জানান, তহবিলের বিষয়ে তাঁর কাছে তথ্য নেই, খোঁজ নিয়ে জানাতে হবে।

চুয়েটেকসুর কার্যালয়ও এখন তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশের টিনশেড ভবনটি দুই দশক ধরে পরিত্যক্ত। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন কার্যালয়টি ছাত্রলীগের দখলে ছিল এবং সেখানে মাদক সেবন ও শিক্ষার্থী নির্যাতনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। কম্পিউটারবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী জামিল আহসান অভিযোগ করেন, ২০১৮ সালে তাঁকে ক্যাম্পাসে আটকে মারধর করা হয় এবং পরে মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানো হয়।

বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা সংসদ পুনরায় চালুর দাবি তুলেছেন। তাঁদের মতে, এটি গণতান্ত্রিক চর্চার অপরিহার্য প্ল্যাটফর্ম। চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নাহিন মুনকার বলেন, “সংসদ থাকলে নির্বাচিত প্রতিনিধি আমাদের দাবি প্রশাসনের কাছে তুলতে পারতেন। তবে সংসদকে দলীয় রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখতে হবে।” পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী রবিউল আউয়াল বলেন, “শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা ও নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য সংসদ জরুরি। প্রশাসনের জবাবদিহিও বাড়বে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মাহমুদ আবদুল মতিন ভূঁইয়া বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি উঠলে প্রশাসন সংসদ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেবে। তিনি আরও জানান, সংসদ তহবিল অন্য কোনো খাতে ব্যবহার হওয়ার কথা নয়, তবে শিক্ষার্থীদের উন্নয়নসংক্রান্ত কাজে ব্যয় হচ্ছে কি না, সেটি খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত