বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

চট্টগ্রামে বিএনপির আসন দখলে প্রস্তুত তরুণ উত্তরসূরিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক :

দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতির মঞ্চে উত্তরাধিকারের ধারা নতুন নয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে পরিবারের সদস্যরা রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিও এর বাইরে নয়। আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে বিএনপি—সব বড় রাজনৈতিক দলেই পরিবারভিত্তিক উত্তরসূরিদের উত্থান লক্ষ্য করা যায়। রাজনীতির মাঠে যেমন অভিজ্ঞ প্রবীণরা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি নতুন প্রজন্মও বাবাদের পথ অনুসরণ করে রাজনীতির ময়দানে আসন দখলের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে এই উত্তরাধিকারের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতার সন্তান এখন সক্রিয়ভাবে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছেন। অনেকে ইতোমধ্যেই নিজ যোগ্যতায়ও পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। চট্টগ্রামের পাঁচটি আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে নাম লিখিয়েছেন বিএনপির ছয়জন প্রবীণ নেতার সাত সন্তান। তাদের মধ্যে রয়েছেন— ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সাঈদ আল নোমান, শাকিলা ফারজানা, ইসরাফিল খসরু, জহিরুল ইসলাম চৌধুরী ও মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী। প্রত্যেকেই পারিবারিক উত্তরাধিকার ও ব্যক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয়।

ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন বর্তমানে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। দীর্ঘদিন ধরে দলের কূটনৈতিক উইংয়ে কাজ করছেন তিনি। চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চাইছেন হেলাল। তার বাবা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী মীর নাসির উদ্দিন ২০১৮ সালে এ আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। মীর নাছির শুধু মন্ত্রীই ছিলেন না, তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও নগর বিএনপির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সুবাদে স্থানীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব এখনো প্রবল। বাবার অনুসারীদের পাশাপাশি নিজের সাংগঠনিক দক্ষতায়ও হেলাল চট্টগ্রাম বিএনপিতে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। নগর, দক্ষিণ ও উত্তর বিএনপির বিভিন্ন কমিটিতে তার অনুসারীরা শীর্ষ পদে রয়েছেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মীর হেলাল শুধু হাটহাজারী নয়, কোতোয়ালি আসন থেকেও মনোনয়ন চাইতে পারেন। ফলে তার প্রার্থিতা নিয়ে দলীয় অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে।

চট্টগ্রাম বিএনপির রাজনীতিতে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নাম এখনও সমানভাবে উচ্চারিত হয়। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি সংসদে চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এ নেতার ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী এবার চট্টগ্রাম-৭ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী। সালাহউদ্দিন জীবদ্দশায় ফটিকছড়ি ও রাউজান আসন থেকেও একাধিকবার নির্বাচন করেছেন। বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও নিজস্ব সাংগঠনিক ভূমিকার কারণে হুম্মামকে ইতোমধ্যেই তরুণ কর্মীরা সমর্থন জানাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপির তরুণ প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন সাঈদ আল নোমান। তার বাবা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান এ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। নিবেদিতপ্রাণ এই নেতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিএনপির হয়ে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে এগিয়ে এসেছেন সাঈদ। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি রাজনীতির ময়দানে কর্মীদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে তার মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে দলীয় মহলে আশাবাদ রয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে ইসরাফিল খসরু বর্তমানে বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপকমিটির সদস্য। বাবার ব্যস্ত রাজনৈতিক সূচির কারণে এলাকায় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন তিনিই। ইসরাফিল দীর্ঘদিন ধরে দলের গবেষণা সেলে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি সপ্তাহে কয়েক দিন চট্টগ্রামে থেকে স্থানীয় রাজনীতিকে সক্রিয় রাখছেন। দলীয় নেতাদের মতে, বাবার ছায়াতেই নয়, বরং নিজের সক্ষমতা নিয়েও তিনি আসন্ন নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন।

ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা বিএনপির প্রয়াত উপদেষ্টা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের কন্যা। এক সময় মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ওয়াহিদুল আলম। তিনি হাটহাজারী আসন থেকে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে শাকিলাও এবার ওই আসন থেকেই মনোনয়ন চাইছেন।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির প্রয়াত সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য। তার মৃত্যুর পর এখন সেই আসনেই বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন তার দুই ছেলে—জহিরুল ইসলাম চৌধুরী ও মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী। একই আসনে দুই ভাইয়ের মনোনয়নপ্রত্যাশা দলীয় মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত দলের কৌশল অনুযায়ী কাকে প্রার্থী করা হবে, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে সবার মধ্যে।

চট্টগ্রামের বিএনপি রাজনীতিতে বাবাদের উত্তরাধিকার ধরে রাখতে তরুণ প্রজন্ম একে একে এগিয়ে আসছেন। কেউ বাবার জনপ্রিয়তার ভরসায়, কেউবা নিজ যোগ্যতায় দলের শীর্ষ মহলে জায়গা করে নিয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় এ তরুণ নেতাদের ভূমিকা যে গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে, তা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত