দীর্ঘ ৩৫ বছরের প্রতীক্ষার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাসের প্রায় ২৭ হাজার তরুণ ভোটারের মাঝে বইছে নির্বাচনী আমেজ। আগামী ১৫ অক্টোবর সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে এই ভোটগ্রহণ। এর মধ্যে অনেকগুলো প্যানেল ও প্রার্থীরা তাদের ইশতেহার জানিয়ে দিয়েছেন। তবে দীর্ঘদিনের এই স্থবিরতা কাটিয়ে ছাত্র রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চাকসুতে কেমন নেতৃত্ব খুঁজছেন শিক্ষার্থীরা, আর প্রার্থীদের কাছেই বা তাঁদের চাওয়া-পাওয়া কী—এসব বিষয়ে জেগেছে নানা প্রত্যাশা।
ভোটারদের প্রত্যাশার মূল কেন্দ্রে রয়েছে এমন নেতৃত্ব, যারা হবেন শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে আপোসহীন। তাঁরা চান না এমন কাউকে নির্বাচিত করতে, যারা কেবল রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি করবেন বা কর্তৃপক্ষের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকবেন। এছাড়া আবাসন সংকট নিরসন, হলের ডাইনিং খাবারের মান উন্নয়ন, এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা ও উন্নত গবেষণা পরিবেশ নিশ্চিত করবে এমন প্রার্থীর প্রত্যাশা করছেন।
তবে এরমধ্যে চাকসু নির্বাচনকে ঘিরে অনেকগুলো প্যানেল ও প্রার্থীরা তাদের ইশতেহার দিয়েছেন। যারমধ্যে ক্যাম্পাসের যে বড় দুটি ছাত্র সংগঠন—ইসলামী ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল—গতকাল তাদের ইশতেহার দিয়েছে। এসব ইশতেহারে শিক্ষা, আবাসন, পরিবহন এবং শিক্ষার্থী নিরাপত্তা সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি থাকলেও, শিক্ষার্থীরা এখন আলোচনা করছে যে এই প্রতিশ্রুতিগুলো তারা কতটুকু পূরণ করতে পারবে।
চাকসুর নেতৃত্বে কেমন প্রার্থী আসবে তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা:
“চাকসু নির্বাচনে কেমন প্রার্থী প্রত্যাশা করে ” এই প্রশ্নের জবাবে রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাদিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা এমন প্রার্থীই আশাকরি যারা হবে সৎ, কর্মঠ, শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে নিবেদিতপ্রাণ এবং ছাত্র সংসদের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত। আমরা এমন একজনকে আশা করি যিনি কেবল প্রতিশ্রুতি দিতেই পটু নন, বরং যিনি সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরি ও কার্যকর করতে সক্ষম।”
একই বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বাধঁন মহন্ত বলেন, “আমি এমন একজন প্রার্থী চাই, যিনি আমাদের লাইব্রেরি বা ল্যাবগুলোতে অনেক সময় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা আধুনিক বইয়ের অভাব দেখা যায়। আমরা চাই, চাকসু নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বাজেট বাড়াতে এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি প্রচলনে সহায়তা করবে। এছাড়া একজন ছাত্রনেতা শুধুমাত্র মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নেবেন না, বরং একাডেমিক উন্নতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন।”
নির্বাচন বিষয়ে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে শিক্ষার্থী জনি হোসাইন বলেন, “আবাসন সংকট আমাদের সবচেয়ে বড় ভোগান্তির জায়গা। মেধা তালিকায় চান্স পাওয়ার পরও অনেক ছাত্রকে হলে থাকতে না পেরে বাইরে থাকতে হয়। এতে খরচ বাড়ে, পড়াশোনায় মন দেওয়া কঠিন হয়। আমাদের প্রত্যাশা, চাকসু নেতারা নতুন ছাত্র হল নির্মাণের এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আসন বণ্টনের জন্য কাজ করবেন। আমরা চাই, হলগুলো যেন সকল শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়। এছাড়া ডাইনিংয়ের খাবারের মান বাড়ানোর বিষয়েও তারা কঠোর পদক্ষেপ নেবেন—এই আশা রাখি।”
চাকসু নির্বাচনে নারী শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা :
এদিকে, নারী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ও শাটল ট্রেনের নিরাপত্তাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা চান, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যেন নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস এবং শাটল ট্রেনের নিরাপত্তা জোরদার করতে জরুরি ব্যবস্থা নেন।
চাকসুর নেতৃত্বে কেমন প্রার্থী চান এমন প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের নারী শিক্ষার্থী অহনা হালদার বলেন, “আমি চাচ্ছি যে নেতৃত্বে এমন প্রার্থী আসুক, যিনি ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে পারে। ক্যাম্পাসে যে মারামারি, সহিংসতা যে সকল সমস্যাগুলো রয়েছে তা বন্ধ করতে পারে এবং ক্যাম্পাসকে নিরাপদ করতে পারবে।এছাড়া নারীদের সুরক্ষা বা নিরাপত্তা দিতে পারবে এবং শাটল ট্রেনের নিরাপত্তা জোরদার করতে পারবে এমন প্রার্থীই আমরা চাই। আর ইশতেহার যেটা করা সম্ভব নয় এমন ইশতেহার না দিয়ে, যেটা করা সম্ভব বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি হয় এমন ইশতেহার চাই।”
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষা বর্ষের আরেক নারী শিক্ষার্থী কাজী ফারজিদা ইসলাম বলেন, “প্রার্থী কেমন চাই এটা আলোচনা বা এভাবে সারসংক্ষেপে তো শেষ করা যাবে না। তবে আমাদের মেয়েদেরকে আবাসন সমস্যা ও যাতায়াত সমস্যা এমন অনেক ধরনের সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। আমি একজন ভোটার হিসেবে প্রত্যাশা থাকবে যে, নারী শিক্ষার্থীদের প্রতিটি আবাসিক হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তুকিতে স্যানিটারি প্যাড ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন করতে পারবে। এছাড়া ফ্যাকাল্টি ও লাইব্রেরিসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল স্থানে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য চাইল্ডকেয়ার সুবিধা ও ব্রেস্টফিডিং কনার সম্বলিত কমনরুম নিশ্চিত করতে পারবে। মসজিদগুলোতে নারী শিক্ষার্থীদের নামাজ আদায়ের জন্য আলাদা জায়গার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এছাড়া একজন সৎ দায়িত্বশীল কঠোর পরায়ন প্রার্থী হচ্ছে চাওয়া পাওয়া।”
কেমন প্রার্থী চাই? এর জবাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের আরেক নারী শিক্ষার্থী হালিমা আক্তার মিরা বলেন, “যে প্রার্থী যোগ্য ও শিক্ষার্থীবান্ধব এমন প্রার্থী নেতৃত্বে চাই। এছাড়া আমরা কোনো প্যানেল না, যে যোগ্য তাকেই ভোট দিবো। আমরা আশ করছি, যে প্রার্থী শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলবে। যেমন- মেয়েদের নিরাপত্তা, আবাসন সংকট নিরসন, পরিবহন সংকট নিরসন ও খাবারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। অর্থ্যাৎ যে সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা ভুগছি সেগুলো সমাধান করবে এমন প্রার্থী আমরা চাই।”
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের হিবা ইসলাম বলেন, “চাকসু নির্বাচন নিয়ে সত্যিকার অর্থে কয়েক মাস আগেও আমি অবগত ছিলাম না। কিন্তু আসন্ন চাকসু নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসের প্রতিটা পরিবেশে একটা অন্যরকম আমেজ দেখতেছি। ইনজয় করতেছি প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা। সবাই আসলে খুব ভালো ভালোই ইশতেহার দিছে। দেখার বিষয় হচ্ছে যে, নির্বাচিত হওয়ার পর কে কতটা করছে। কিন্তু একজন সাধারন শিক্ষার্থী হিসেবে বা শহরগামী শিক্ষার্থী হিসেবে আমি চাই যে, নির্বাচিত প্রার্থীরা– যারা শহরে থাকছে তাদেরকে নিয়ে ভাবে আবার যারা ক্যাম্পাসে থাকছে তাদেরকে নিয়ে ভাবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রতিটা ক্ষেত্রেই খাদ্য, যোগাযোগ, আবাসন নানা ক্ষেত্রেই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তাই আমি চাই প্রার্থী যেই হোক, আমাদের এই সমস্যা গুলো নিরসনের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের এই দাবিগুলো তুলে ধরে। এটা যারা করতে পারবে আমার মতে তারাই যোগ্য প্রার্থী।”
এদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ভোটার রয়েছে ২৭ হাজার ৫’শ ১৮ জন। যারমধ্যে ছাত্র রয়েছে ১৬ হাজার ১’শ ৮৯ এবং ছাত্রী রয়েছে ১১হাজার ৩’শ ২৯জন। এরমধ্যে চাকসুতে মোট প্রার্থী হয়েছেন ৯০৮ জন


