শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Single Top Banner

মামলায় স্থবির রেলওয়ের ক্যাটারিং ঠিকাদার নিয়োগ

পূর্বাঞ্চলের ১০ আন্তঃনগর ট্রেনে নতুন দরপত্র আটকে দিয়েছে পুরনো সিন্ডিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চট্টগ্রাম–কক্সবাজারসহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুটে চলাচলরত ১০টি আন্তঃনগর ট্রেনে নতুন করে ক্যাটারিং সার্ভিস (খাবার সরবরাহ) পরিচালনায় ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আদালতের মামলার জটিলতায় পুরো প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে—রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে বহু বছর ধরে কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা পুরনো ঠিকাদারি সিন্ডিকেটগুলোই ইচ্ছাকৃতভাবে রিট মামলা করে নতুন দরপত্র আটকে দিয়েছে, যাতে তারা পুরনো নিয়মেই ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে।

রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (অপারেশন) শহিদুল ইসলাম গত ১৬ অক্টোবর রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম–কক্সবাজার, ঢাকা–কক্সবাজার এবং ঢাকা–চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে চলাচলরত সৈকত এক্সপ্রেস, প্রবাল এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেসসহ মোট ১০টি আন্তঃনগর ট্রেনে আগামী তিন বছরের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন ক্যাটারিং ঠিকাদার নিয়োগের লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করেন। রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগ জানায়, গত পাঁচ বছর ধরে পূর্বাঞ্চলে নতুন করে কোনো ঠিকাদার নিয়োগ হয়নি। একসময় ২০২০ সাল পর্যন্ত বৈধতা পাওয়া ১৬টি প্রতিষ্ঠানই এখনো টেন্ডার ছাড়াই পূর্বাঞ্চলের ২৬টি ট্রেনে খাবার সরবরাহ করে আসছে। অথচ তাদের দায়িত্বকাল অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করলেও মামলা ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের চাপে তা বারবার বন্ধ হয়ে যায়।

২০২৩ সালে নতুন করে ক্যাটারিং সার্ভিসের জন্য আবেদন আহ্বান করলে ব্যাপক সাড়া পড়ে। মোট ৪৫টি প্রতিষ্ঠান আবেদন ফরম সংগ্রহ করে এবং এর মধ্যে ৪২টি প্রতিষ্ঠান আবেদন জমা দেয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই নিয়ম অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকা অফেরতযোগ্য টাকা জমা দেয়। যাচাই-বাছাই শেষে ৩৭টি প্রতিষ্ঠান যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। বাদপড়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের একটি প্রতিষ্ঠান হাইকোর্টে রিট মামলা করলে আবারও নিয়োগ প্রক্রিয়া ঝুলে যায়। ফলে রেলওয়ের দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন ঠিকাদারি ব্যবস্থা চালুর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটিও আটকে গেল আইনি জটিলতার কারণে।

পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক মো. শওকত জামিল মোহসী বলেন, ক্যাটারিং সার্ভিসের টেন্ডার প্রক্রিয়া মূলত রেলভবন থেকেই পরিচালিত হয়। পূর্বাঞ্চলের ১০টি আন্তঃনগর ট্রেনে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের জন্য প্রকাশিত দরপত্রের কার্যক্রম আদালতের মামলার কারণে বর্তমানে বন্ধ আছে। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পূর্বাঞ্চলে বহু বছর ধরে একই সিন্ডিকেট ক্যাটারিং ব্যবসা দখল করে রেখেছে। প্রতিযোগিতা এড়াতে এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তারা বিভিন্ন সময় মামলা করে টেন্ডার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়।

মামলার বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আইন কর্মকর্তা মো. আল মাহমুদ বলেন, পূর্বাঞ্চলে এক হাজার চারশর বেশি মামলা চলছে। যে কোনো মামলার কারণে বড় সিদ্ধান্ত নিতে বাধা সৃষ্টি হয়। ক্যাটারিং সার্ভিসের নিয়োগ সংক্রান্ত মামলাটিও আমরা পরিচালনা করছি, তবে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

নতুন ঠিকাদার নিয়োগের জন্য যেসব ট্রেনে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল সৈকত এক্সপ্রেস, প্রবাল এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, পর্যটক এক্সপ্রেস, চিলাহাটি এক্সপ্রেস, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, বেনাপোল এক্সপ্রেস ও রুপসী বাংলা এক্সপ্রেসসহ পূর্বাঞ্চলের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর ট্রেন। যাত্রীদের উন্নত, মানসম্মত এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এসব ট্রেনে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ ছিল জরুরি। কিন্তু মামলার কারণে তা কবে সম্ভব হবে, সে বিষয়ে কেউই নিশ্চিত নন।

এদিকে যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, পুরনো ঠিকাদাররা টেন্ডার ছাড়াই যেভাবে বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে খাবারের মান দিন দিন আরও নিম্নমানের হয়ে পড়েছে। রেলওয়ের পরিকল্পনা ছিল নতুন ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে এই খাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং মানসম্মত ক্যাটারিং সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু মামলার জটিলতা কাটতে না কাটতেই নতুন উদ্যোগ থমকে যাওয়ায় যাত্রীরা আবারও পুরনো অবস্থায় ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

রেলওয়ের ভেতরের একাধিক সূত্র বলছে, সিন্ডিকেটের প্রভাব এতটাই গভীর যে তারা আদালতের রিট, প্রভাবশালী যোগাযোগ, এমনকি প্রশাসনিক চাপ—সবকিছু ব্যবহার করে নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে রেলওয়ের বাণিজ্যিক সেবা ও যাত্রী সেবার মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, মামলার নিষ্পত্তির পরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। তবে কবে সেই প্রক্রিয়া শেষ হবে তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না। মামলা ঝুলে থাকলে পূর্বাঞ্চলের ট্রেনগুলোতে ক্যাটারিং সার্ভিসের মানোন্নয়ন এবং নতুন ঠিকাদার নিয়োগ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকেই এগোচ্ছে।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত