চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জিপিএইচ ইস্পাত কারখানার বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও সংখ্যালঘু পরিবারের ৭৮ শতক জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে রোববার সকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন ভুক্তভোগীরা।
গত ১০ নভেম্বর ভুক্তভোগী পরিবার চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে জিপিএইচ ইস্পাতের তিন মালিক—ডিএমডি আলমাস শিমুল, তার ভাই জাহাঙ্গীর আলম ও আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে মামলা করেন। আদালত মামলা গ্রহণ করে সীতাকুণ্ড থানার পুলিশ পরিদর্শককে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ
মামলার অভিযোগে জানা যায়, প্রায় দেড় দশক আগে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা নূর নবীর পরিবারের মালিকানাধীন ৭৮ শতক জমি দখল করে তা কারখানার সীমানার অন্তর্ভুক্ত করে জিপিএইচ ইস্পাত। পরে এক নারীর কাছ থেকে জমিটি ক্রয় করার দাবি দেখিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে নতুন দলিল তৈরি করে জমি আত্মসাৎ করা হয়। বর্তমানে ওই জমির ওপর প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রশাসন ও গ্রাম আদালতে বহুবার অভিযোগ জানালেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। প্রকৃত মালিক repeatedly জমি ফেরতের দাবি জানালেও জিপিএইচ কর্তৃপক্ষ তা তোয়াক্কা করেনি।
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মরহুম নূর নবীর স্ত্রী আনোয়ারা বেগম, জমির মালিক কাউসার জাহান আক্তার, মুক্তিযোদ্ধা সূর্য মোহন নাথসহ পরিবারের সদস্যেরা।
তারা জানান, সবুরা খাতুনের মেয়ে আনোয়ারা বেগমসহ মোট ৯ জন উত্তরাধিকার সূত্রে জমিটির মালিক। বিএস জরিপেও জমিটি মরহুম নূর নবীর স্ত্রী সবুরা খাতুনের নামে চূড়ান্তভাবে লিপিবদ্ধ। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জিপিএইচ ইস্পাত জমিটি দখল করে নেয়।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিএমডি আলমাস শিমুল, জাহাঙ্গীর আলম ও স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার যোগসাজশে পরিবারটিকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়। বাঁশবাড়িয়া ইউপির তৎকালীন চেয়ারম্যান শওকত আলী জাহাঙ্গীর, তার শ্যালক জনি এবং কুমিরা ইউপির তৎকালীন চেয়ারম্যান মোরশেদ হোসেনকে বিলাসবহুল গাড়ি উপহার দিয়ে তাদের দখল প্রক্রিয়া সহায়তা করা হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা আরও জানান, যখনই কেউ মামলা করতে যেতেন, তখন শওকত ও মোরশেদ ভয়ভীতি প্রদর্শন করে মামলা করতে দিতেন না। ফলে দীর্ঘদিন আইনের আশ্রয় নিতে পারেননি ভুক্তভোগীরা। ৫ আগস্টের পর শওকত ও মোরশেদ এলাকা ছেড়ে পালানোর সুযোগে পরিবারটি মামলা করতে সক্ষম হয়।
বাড়িঘর উচ্ছেদ ও পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ
আনোয়ারা বেগম বলেন, “দেড় দশক আগে আমাদের জমি দখল করে কারখানা গড়ে তোলে জিপিএইচ ইস্পাত। তখন এগুলো ধানিজমি ছিল। অল্প কিছু জমি কিনে বাকি সব দখল করে নেয়। হিন্দু পরিবারের বাড়িসহ অনেক ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করা হয়েছে। চারদিকে সীমানাপ্রাচীর দিয়ে আমাদের জমিগুলো আটকে রাখা হয়েছে, আমরা ঢুকতে পারি না।”
তিনি অভিযোগ করেন, কারখানার কারণে বর্ষায় এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দেওয়ায় এলাকা ডুবে থাকে।
এলাকাবাসীর দাবি, বছরের পর বছর পরিবেশ বিনষ্ট করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয় পাহাড়ি ছড়া দখল করে তিনটি কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ, ছড়ার গতিপথ পরিবর্তন, সওজের জমি দখল, কৃষিজমি কব্জা, অতিরিক্ত শব্দদূষণ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নষ্ট করে বন্যার ঝুঁকি বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
মানবাধিকার কর্মীর ওপর মামলা ও হয়রানির অভিযোগ
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী আবু বক্কর চৌধুরী জানান, জিপিএইচ ইস্পাতের দখল ও পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলায় গত ১৬ বছরে তাকে ২০টি বানোয়াট মামলায় হয়রানি করা হয়েছে। সর্বশেষ সীতাকুণ্ড থানার সাবেক ওসি তোফায়েল আহমেদের মাধ্যমে তাকে ও তার এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলেকে গ্রেপ্তার করিয়ে জেলে পাঠান আলমাস শিমুল।
তার অভিযোগ, “ওদের কারণে এলাকা এখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।”


