শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Single Top Banner

লোকবল সংকটে সিএমপি: থানায় শূন্যপদ বাড়ায় নিরাপত্তা ব্যাহত

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) থানা ও ফাঁড়িগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে তীব্র লোকবল সংকট। গণঅভ্যুত্থানের পর বিপুল সংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য বিভিন্ন জেলা–উপজেলায় বদলি হলেও শূন্যস্থান আর পূরণ হয়নি। অবসর, রদবদল, লাইনে সংযুক্তিকরণসহ নানা কারণে জনবল কমে কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের চাপে। ফলে সীমিত সদস্য নিয়ে পুরো ব্যবস্থাকে সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ।

একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, জনবল ঘাটতির কারণে থানাগুলোতে নিয়মিত কার্যক্রম চালাতে প্রচণ্ড সমস্যা হচ্ছে। বদলি হওয়া সদস্যদের জায়গা পূরণ না হওয়ায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পড়ে থাকাদের ওপর। কেউ ছুটিতে গেলে সেই শূন্যতা আরও বেড়ে যায়। আবার বছরের পর বছর এক থানায় চাকরি করার পর নিয়মমাফিক বদলি করা হলেও অনেকে পরবর্তীতে ফের একই থানায় ফিরে আসেন। গণঅভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা পুলিশ সদস্যদের সিএমপিতে বদলির নির্দেশনা থাকলেও তারা অনেকেই আর যুক্ত হতে পারেননি।

সিএমপির ঊর্ধ্বতনরা জানান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পুলিশের ডিউটির সময় ছয় ঘণ্টা হলেও বাস্তবে সদস্যদের ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় যথাযথভাবে ছুটি কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগও থাকে না। পাশাপাশি সব পুলিশ সদস্য সরাসরি অপরাধ দমন বা টহল দায়িত্বে থাকেন না—অনেকেই ভিআইপি প্রটোকল, আদালত, দূতাবাস, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও বিভিন্ন পরীক্ষার দায়িত্বে থাকেন, ফলে থানার কাজে লোকবল চাপ আরও বাড়ে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্সের তথ্য অনুযায়ী সিএমপিতে মোট সদস্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার। এর একটি বড় অংশ বিভিন্ন বিশেষ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকায় থানা পর্যায়ে এই সংকট বেশি দৃশ্যমান। ৫ আগস্টের পর বহু সদস্য কাজে যোগ না দেওয়া ও পলাতক থাকাও জনবল ঘাটতির কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা পাহাড়তলী থানায় উপপরিদর্শক থাকার কথা ২৫ জন; বর্তমানে আছেন মাত্র ১০ জন। সহকারী উপপরিদর্শক ও কনস্টেবলও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ১৩.৩১ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে হাসপাতাল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্কুল–কলেজ, মার্কেট ও বড় পাইকারি বাজার থাকায় এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশকে। একইভাবে বাকলিয়া থানায় এসআই ও এএসআইয়ের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পুলিশ সূত্র জানায়, কাঠামো অনুযায়ী প্রতি ১,৪০০ জনে একজন পুলিশ সদস্য থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনেক কম—যেখানে উন্নত বিশ্বে ৩০০ জনে একজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন।

গণঅভ্যুত্থানের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের ঝটিকা মিছিল, নাশকতার আশঙ্কা ও গ্রেপ্তার অভিযানে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ায় থানার কর্মকর্তাদের ওপর ব্যাপক জবাবদিহি তৈরি হয়েছে। কোনো এলাকায় এ ধরনের মিছিল হলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জবাবদিহির মুখোমুখি হন, অনেক সময় লাইনে সংযুক্ত হতে হয়। তাই অনেক সদস্য ঝামেলাপূর্ণ থানা দায়িত্ব এড়িয়ে সিটিএসবি, কাউন্টার টেররিজমসহ বিশেষায়িত শাখায় বদলি হতে চাইছেন, যেখানে রাজনৈতিক চাপ তুলনামূলক কম।

এই সংকট নিয়ে সিএমপির সহকারী কমিশনার (গণসংযোগ) আমিনুর রশিদ বলেন, দেশে মানুষের তুলনায় পুলিশের সংখ্যা খুবই কম। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন, অপরাধ দমন এবং নাগরিকের জানমাল রক্ষায় পুলিশে জনবল বাড়ানো এখন জরুরি। তিনি মনে করেন, জনবল সংকট দূর হলে পুলিশ আরও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, জনবল কম থাকলে বিশ্রাম, ছুটি, মানসিক চাপ সামলানো কিংবা পরিবারকে সময় দেওয়া—সবকিছুই ব্যাহত হয়। এতে দায়িত্ব পালনে প্রভাব পড়ে এবং জননিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। তাই দ্রুত সরকারি উদ্যোগে জনবল নিয়োগ বাড়ানো ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত